জন-প্রতিনিধিকে, জনগণের বিক্ষোভ দেখানো কি গণতান্ত্রিক দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে আঘাত করে?
What is the incident
৫ই জানুয়ারি ২০২০, ঘড়ির কাঁটা দুপুর দুটো পেরিয়েছে, পাঞ্জাবের ফিরোজপুর থেকে আনুমানিক তিরিশ
কিলোমিটার দূরে কৃষকদের বিক্ষোভ
অবরোধে হাইওয়ের উপর প্রায় ১৫-২০ মিনিট আটকে
থাকল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কনভয়।
Why it is considered as NEWS
প্রধানমন্ত্রী
একটা সাংবিধানিক পদ। ইতিমধ্যে বর্তমান
প্রধানমন্ত্রী প্রায় মৃত্যু মুখ থেকে বেঁচে
ফিরে আসার অভিজ্ঞতার কথা
জানিয়েছেন। দেশের এমন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক
পদের সুরক্ষার জন্য SPG Act 2019 পাশ হয় সংসদে। তদুপরি
এমন সাংবিধানিক পদের সুরক্ষায় ছেদ
পড়া সাধারণ ঘটনা নয়। যদিও
বিক্ষোভ জমায়েত ভারতীয় নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু ভারতীয় আইনবিধি অনুসারে কোথায় কোথায় এই সাংবিধানিক অধিকার
প্রযোজ্য তা নিয়ে দ্বন্দ্ব
আছে। মূলত একজন ভারতীয়
নাগরিক, যিনি ভোটে জিতে
সাংসদ হয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক
দলের মনোনয়নে প্রধানমন্ত্রী হন, তার গাড়ি অবরোধে আটকে থাকা থেকেও ‘ মৃত্যু
মুখ থেকে ফিরে আসা’ একটা
সাধারণ অবরোধের ঘটনাকে সংবাদে পরিণত করে।
What is the point
ফিরোজপুরে
প্রধানমন্ত্রীর স্থলপথে রাস্তা
দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা ছিল না।
কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় আকাশ পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদলে পাঞ্জাব সরকারের
সাথে কথা বলে SPG রাস্তা
দিয়ে যাত্রাপথের পরিকল্পনা করে । কিন্তু
ফিরোজপুর পোঁছানোর আগেই বিক্ষোভের মুখে
পড়ার দরুন প্রধানমন্ত্রীর কনভয়
বাধ্য হয়ে ভাটিন্ডা বিমান
বন্দরের দিকে ফিরে যায়।
প্রধানমন্ত্রীর
সুরক্ষার জন্য SPG তাদের গোপনীয়তায় নির্দিষ্ট নিয়ম মাফিক কাজ
করে। যার পেছনে বছরে
ব্যয় ৫০০,০০,০০,০০০ টাকা। তা
সত্বেও প্রধানমন্ত্রীর জীবনের আশঙ্কা তৈরি হওয়া ভারতের
স্বরাষ্ট্র দফতরের জন্য যথেষ্ট লজ্জা
ও উদ্বেগজনক।
পাঞ্জাবের
বহু জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফর কেন্দ্র করে
অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ
একবছরের বেশি সময় ধরে
চলা কৃষক আন্দোলন দাবি
আদায়ের পর শেষ হলেও
সরকার তার প্রতিশ্রুতি পালন
করেনি। নুন্যতম সহায়ক মূল্য সংক্রান্ত যে কমিটি ১৫ই
জানুয়ারির মধ্যে তৈরি হওয়ার কথা
ছিল, তার কাজ এখনও
শুরুই হয়নি। এছাড়াও লখিমপুরে গাড়ি চাপা দিয়ে আন্দোলনের কৃষকদের খুন করার পেছনে প্রধান
অভিযুক্ত আশিস মিশ্রের পিতা অজিত মিশ্রের
বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া
হয়নি, বরং এখনও বহাল
তবিয়তেই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে বসে আছেন তিনি। প্রসঙ্গত এই কৃষক আন্দোলনে সাতশোর বেশি কৃষক মারা
যান আন্দোলন চলাকালীন। এই
ক্ষোভ থেকে বেশ কিছু
কৃষক সংগঠন নির্দিষ্ট হাইওয়ে ছাড়াও সারা পাঞ্জাব জুড়েই
প্রতিবাদ বিক্ষোভ চালাচ্ছিলেন।
What is going on practical ground
এখনও
পর্যন্ত AIKS এর পক্ষ থেকে
কোনও বিবৃতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু পাঞ্জাবের কংগ্রেস সরকার এবং কেন্দ্রের বিজেপি
সরকারের মধ্যে অশালীন রাজনৈতিক তরজা চরমে উঠছে।
বিজেপি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক
পাঞ্জাব সরকারকে সরাসরি দায়ী করছে, আবার
পাঞ্জাব সরকার নিজেদের দায় ঝাড়তে টুইট
করে ফিরোজপুরের লোকশূণ্য জনসভার ছবি দেখিয়ে বিজেপির রাজনৈতিক নাটক বলে কটাক্ষ
করেছে। পালটা বিজেপি জানাচ্ছে কংগ্রেস সরকার ইচ্ছাকৃত এই ‘গুন্ডাগিরি’ করেছে। ইতিমধ্যেই সংবাদ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কনভয় আটকে দেওয়ার
বিক্ষোভে বিজেপির পতাকা উড়তে দেখা যায়
ভিডিও ফুটেজে। যদিও কোনও ব্যক্তি
কেন বিজেপির পতাকা নিয়ে বিজেপি দলেরই
প্রধানমন্ত্রীকে বিক্ষোভ দেখাবে তা নিয়ে ধোঁয়াশা
আছে। এই নিয়ে কোনও
কৃষক সংগঠনের তরফে এখনও বিবৃতি
পাওয়া যায়নি। তবুও ভিডিও ফুটেজে
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর
কনভয় ঘিরে সশস্ত্র বাহিনী
দাঁড়িয়ে আছে এবং তার
থেকে কিছুটা দূরে কৃষকেরা শান্তিপূর্ণ
বিক্ষোভ দেখিয়ে রাস্তা অবরোধ করে রেখেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর
গাড়ি যখন পিছনে ফিরে
যেতে থাকে তখন কৃষকরাও
বিক্ষোভ দেখাতে গাড়ির পিছনে যায়।
What we Think
ভারতের
প্রধানমন্ত্রী পদের ইতিহাসে বর্তমান
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পেছনে ভারত সরকারে ব্যয়
সর্বাধিক। তিনি যে বিশেষ
সুরক্ষা প্রদানকারী গাড়ি ব্যবহার করেন
তার আনুমানিক বাজার মূল্য ছিল ১২ কোটি টাকা। তিনি যে বিমান-যান ব্যবহার করেন
আকাশ পথে যাতায়াতের জন্য
তার বাজার মূল্য ৪,৫০০ কোটি টাকা। কেবলমাত্র দেশের একটা ব্যক্তির সুরক্ষার
পেছনে সরকার বছরে পাঁচশো কোটি টাকা ব্যয় করে যে
টাকা আসে সাধারণ মানুষের
ইনকাম ট্যাক্স থেকে। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে নির্দিষ্ট অঞ্চলে
SPG র আধিকারিকরা পৌঁছে গোপনে এবং প্রশাসনিক মহলের
সাথে মিলিত ভাবে সম্পূর্ণ নিরাপত্তা
সুনিশ্চিত করে। নির্দিষ্ট দিনে
প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় এবং যাত্রাপথ
SPG-র দ্বারা নির্ধারিত হয়। দেশের এমন
চূড়ান্ত উন্নত ও ব্যয় বহুল
নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি এভাবে ভেঙে
পড়ে তবে ভারতীয় নাগরিক
হিসাবে তা যথেষ্ট উদ্বেগের।
কিছুদিন আগেই প্রধানমন্ত্রীর উত্তরপ্রদেশ
সফরে বেনারস ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীরা সেই সফরের বিরোধিতায়
রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছিল
বলে প্রধানমন্ত্রীর কনভয়ের যাত্রাপথ পরিবর্তন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে
তিনি গঙ্গায় জলপথে যাত্রাপথ পরিবর্তন করেন। কিন্তু হঠাৎ পাঞ্জাব জুড়ে
চলতে থাকা কৃষক বিক্ষোভের
মধ্যে কেন ওই নির্দিষ্ট
রাস্তা দিয়ে কনভয় নিয়ে
আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল তা অবশ্য
তদন্ত সাপেক্ষ। কৃষিবিল প্রত্যাহারের পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর
এই প্রথম পাঞ্জাব সফর। তার এই
ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই
সোশাল মিডিয়ায় গো ব্যাক মোদি
ট্রেন্ডিং-এ ছিল। কিষান একতা মঞ্চ তাদের টুইটার হ্যান্ডেলে স্পষ্ট গো ব্যাক মোদি
হ্যাশট্যাগ দিয়ে জানায় “ We do not welcome the killer of our
precious lives We do not welcome the one who has ruined so many lives We do not
welcome the one who’s saving the culprits & blaming the victims”। যদিও এই
বিক্ষোভের মধ্যে কীভাবে বিজেপির পতাকা চলে এলো তা নিয়েও ভাবা
প্রয়োজন। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ,
একটা গনতান্ত্রিক দেশে প্রধানমন্ত্রীর কনভয়
আটকে বিক্ষোভ দেখালে চারিদিকে এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার
বেষ্টনীতে থাকা সত্ত্বেও তা
প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু ভয় জাগিয়ে তোলে।
যদিও মোদীর মৃত্যু ভয়ের শঙ্কা আগেও
ছিল। ভীমা কোরেগাঁও কেসে বিনা বিচারে বিনা
প্রমাণে জেলে বন্দী করে
রাখা হয়েছে বহু মানুষকে। জনগণের
দ্বারা নির্বাচিত একজন জন-প্রতিনিধিকে
শান্তিপূর্ণ নিরস্ত্র জমায়েতের মাধ্যমে জনগণের বিক্ষোভ দেখানো কি গণতান্ত্রিক দেশের
জাতীয় নিরাপত্তাকে সরাসরি আঘাত করতে পারে? কেননা এর আগে খুব সম্প্রতি সিএএ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ায় উত্তরপ্রদেশের ডাক্তার কাফিল খানকে ন্যাশনা্ল সিকিউরিটি অ্যাক্টে আটক করা হয়। সেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জীবন সংশয় অবশ্যই
দেশের জন্য জাতীয় নিরাপত্তার
আওতায় পড়ে এর মাধ্যমে।
আজও প্রধানমন্ত্রী সেই একই দাবিই
করলেন; ‘বেঁচে ফেরার জন্য’ পাঞ্জাব সরকারকে তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ক্রমশ আমাদের গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকারের পরিসর কিংবা ‘লক্ষণ রেখা’ ছোট হয়ে আসছে
কিনা এ নিয়ে ভাবা
প্রয়োজন।
Where is the Problem
আজ পর্যন্ত পৃথিবীর সব শাসক কিংবা
সরকার এক নায়কত্ব চেয়ে
এসেছে নানান মোড়কে নানান পরিমাপে। সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য বিরোধী নিশ্চিহ্ন
করণ অধিক মানসিক নিরাপত্তা
দেয়। বিরোধী সব কিছুই প্রচলিত
যা কিছু, তার অস্তিত্ব সঙ্কট
তৈরি করে। তাই বিরোধী
সহনশীলতা পাশবিকতা থেকে মানবিক উত্তীরণে
এক দীর্ঘ মেয়াদি অভ্যাস। তাই আলেকজান্ডার থেকে
চন্দ্রগুপ্ত, মোদি থেকে মমতা
বা ট্রাম্প থেকে পুতিন সব
একই সুতোয় বাঁধা। কিন্তু সামান্যতম বিরোধিতা যদি না সমাজে
থাকে, তবে সেই সমাজ
ক্রমশ একই জালে জড়িয়ে
থেমে থাকবে। যত দিন যাবে
নানান আইনের যাঁতাকলে বিরোধিতা ক্রমশ অন্যায়তে পরিণত হবে।
When and how we shall overcome

Comments
Post a Comment