"এই তো আমার, যৌথ খামার"

 
সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন নিঃসন্দেহে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটা বড় ধাক্কা। অনৈতিক ভাবে সংসদ ভবনে বিল পাশ করে বৃহৎ-পুঁজির হাতে তুলে দেওয়া কৃষি ব্যবস্থাকে, এই কৃষি প্রধান দেশের কৃষকরাই কর্পোরেটদের হাত থেকে ছিনিয়ে, পুরনো ক্ষুদ্র পুঁজির মান্ডি জমিদারি প্রথাই আপাতত বহাল রাখতে পারলেন, যা এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল।
 আন্দোলনের নেতৃত্বের রাশ টেনে রেখেছিলেন বেশ কিছু কৃষক সংগঠন, কিছু বামপন্থী দলের সংগঠনের নেতা এবং অবশ্যই প্রচুর বুদ্ধিজীবী সামাজিক মানবাধিকার কর্মী ও সমগ্র দেশের বিদেশের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন।  কিন্তু দীর্ঘ প্রায় একবছর ধরে আন্দোলনকে ভাঙার জন্য সরকারের তাচ্ছিল্য, খালিস্থানি বা মাওবাদী বলে চালিয়ে দেওয়া, দাঙ্গার চেষ্টা, মোলেস্টেশনের চেষ্টা, মন্ত্রীর ছেলেকে দিয়ে দাম্ভিক খুন করে খুনের সংখ্যা ৭০০ পেরিয়ে দিলেও, এই রক্তক্ষয়ী আন্দোলন অহিংস পথেই যে নিজেদের দাবি ছিনিয়ে নিয়েছে এ অবশ্যই সকল ফ্যাসিস্ট দাম্ভিকতার  বিরোধী মানুষদের তীব্র আকাঙ্ক্ষিত জয়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় এরপর কী? WHAT NEXT? এর উত্তরে বামন্থীরা এখনও দিশেহারা। বিশ্ব রাজনীতির আদিম নিয়মানুসারে প্রতি আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলা প্রতিটা রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য হয় তাদের সংগঠন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। এবারও তার ব্যতিক্রম চোখে পড়ল না। সিপিআইএম এবং সিপিআইএমএল সহ সব সংসদীয় বাম দল চক্ষু পর্দা বিসর্জন দিয়ে, নিজেকে মহৎ প্রমাণের চেষ্টায়  সবাই সবাইকে টক্কর দিচ্ছে। অথচ এইমুহূর্তে যদি লেনিনকে মনে করা যায়, তবে একটা কথা খুব স্পষ্ট, নিজেকে ঈশ্বরের স্থানে প্রতিস্থাপিত করার যে আদিম সুপ্ত মনঃস্তত্ব তা এই একবিংশ শতকে এসেও মানুষ কেন কোনও বামপন্থী দলই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। কমিউনিজমের যে সাম্যবাদের প্রধান অন্তরায় 'সুপারহিউম্যান' বা 'ওভার হিউম্যান' ধারণা, তা এই সময়ে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে, আমরা প্রতিটা ব্যক্তিও এই সুপ্ত কামনার বাইরে নই।
এখানেই বামপন্থী দলগুলোর নিজেকে শুধরে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে মার্কসবাদকে অভিযোজিত মানবিক ভঙ্গিতে মানুষের মধ্যে করে প্রয়োগ না করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে মার্কসবাদ বাস্তব সমাজে প্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা হারাবে এবং দর্শনের সিলেবাসের একটা অধ্যায় হয়েই থেকে যাবে। এই কৃষক আন্দোলন কোনও ক্লাস স্ট্রাগল না, এটা একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর সরাসরি স্বার্থে আঘাত লাগার প্রতিক্রিয়া। পরোক্ষ স্বার্থে আঘাত  মধ্যবিত্তের উপর মারাত্মকভাবে পড়লেও অস্বীকার করে লাভ নেই এই আন্দোলনে সমস্ত শ্রেণীর চাষি ( পূর্ণাঙ্গ চাষি, আংশিক চাষি, ভাগ চাষি) সমানুপাতে একত্রিত হয়নি। নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে যেখানে কৃষিই প্রধান সম্বল সেখানকার মানুষের আন্দোলনের প্রতি তীব্রতা তত বেশি ছিল। তাই সে অর্থে শ্রেনী চেতনা নিয়ে এই আন্দোলন সংগঠিত করতে পারেনি বাম-শক্তি। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে প্রতিটা ২০ লাখ কিশোরী থেকে বৃদ্ধা, কিশোর থেকে প্রবীণ ব্যক্তিরা জল-কামান ব্যারিকেড ভেঙে শীতের রাতে খোলা আকাশে রাস্তায় শুয়েছিল, কিন্তু এই জয় এসেছে হাতে গোনা নেতাদের জন্য নয়, বরং রাজপথ আটকে দেওয়া প্রতিটা ব্যক্তিগত কুড়ি লাখ মানুষের অদম্য সাহসী হার না মানার জেদে। গন আন্দোলন থেকে কুড়ি লাখ মানুষকে জেলে ভরে রাখার ক্ষমতা কোনও রাষ্ট্রের বুকে নেই, কেননা এই কুড়ি লাখ মানুষের পেছনে সরকার বাদে বাকি সমস্ত নাগরিকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন ছিল।
তবে এটা মনে করার কোনও কারণ নেই, এই ঘটনা বিজেপির পরাজয়। পুরোপুরি আরএসএস ঘরানায় নির্দিষ্ট গুরু নানক দিবসে মোদী ঘোষণা করেন, তারা কিছু মানুষকে বিল বোঝাতে অপারক, বিলে কোনও ভুল ছিল না। অজয় মিশ্রের ছেলে  ভয় দেখাতে অবলীলায় সাতজনকে পিষে দিল, এই দাম্ভিকতা এবং পৈশাচিকতা হয়ত আমাদের মনে জোর দিয়েছে, কিন্তু সমাজে এই পিষে দেওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক হওয়ার দিকে আরও অনেক ধাপ এগিয়ে গেল। অন্যদিকে আদানীর ফসল স্টোর রুমের জন্য নিজের প্রাইভেট রেলওয়ে ট্রাক বসানো শেষ প্রায়। পুঁজি এত সহজে হার মানবে না, বরং মোদির ভেক ধরে পুঁজি এক পা পিছিয়ে এলো, এই ভুল থেকে শিখে নিয়ে, অভিযোজিত হয়ে এর থেকে বহু জোরে আঘাত আনতে। বিজেপি না আনুক কংগ্রেসে কিংবা জোট সরকার এলেও পুঁজি এদের পাপেট বানিয়ে আবার জোরালো আঘাতের প্ল্যান করছে। এটা আমাদেরও তৈরি হওয়ার সময়।
কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে একটাই প্রশ্ন, এরা যদি সবাই ভোট ব্যাঙ্ক নিয়ে এখনই এত চিন্তিত হয়ে পড়ে, তাহলে সরকারি কিষান বিমা বন্ধ হওয়ার পর উত্তরপ্রদেশে কোম্পানি কৃষক ফসল বিমাতে আড়াই  হাজার-কোটি টাকা লাভ করছে এক বছরে, হিমঘরের মালিকদের দুর্নীতিতে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা মূল্যবৃদ্ধি, ফসলের অনিশ্চিত দাম, এসব ইস্যুগুলো কিন্তু ভোটবাজারে বা মানুষের মস্তিষ্কে ক্রমশ গৌণ হয়ে যাবে। এই দাঙ্গার সময়ে মানুষ ধর্মের জাল থেকে বেরিয়ে একটা অন্য সত্ত্বায় এসে একজোট হয়েছে, এটা আন্দোলনের একটা বড় সফলতা। কিন্তু সেই সাথে বামপন্থী দলগুলো যদি নিজেদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে, সংসদীয় চিন্তায় নিমগ্ন হয় তবে এই ধর্মীয় পরিচিতি ছুঁড়ে ফেলে প্রাথমিক দাবি নিয়ে অন্য সত্ত্বায় পৌঁছে একজোট হল, তারা এই যৌথ খামারের স্বপ্ন দেখতে আরও একটু পিছিয়ে যাবে। বামপন্থীরা অবশ্যই সরকারের সব দমন মূলক, পুঁজিবাদী পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে, কিন্তু সাথে সাথে নিজেদের স্বতন্ত্র একটা দাবি বা আন্দোলন না থাকলে নিজেদের অস্তিত্বের কারণ শুধুই সরকারের পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়ে দাঁড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের চোখে। স্বতন্ত্র লড়াই থেকে জনগণ হয়ে জনগণের মধ্যে না মিশতে পারলে বামপন্থীরা রাজনৈতিক পরিসরে ক্রমশই পরজীবীতে পরিণত হবে।
এই অমানবিক পুঁজিবাদী সমাজে একান্নবর্তী পরিবার যেমন প্রায় বিলুপ্তপ্রায়, তেমনই আমাদের যৌথ খামার শেষ হয় যেতে চলছে অচিরেই, যদি না এঁনাদের সাথে আমরা হাত মিলিয়ে এখনই আমাদের যৌথ খামারের গোলা ভরে তুলি নবান্নে। এই আন্দোলন থেকে শিখে বিনয় এবং স্পর্ধা মিশিয়ে এখন আমরা বলতে পারি, “প্রতি মুহূর্তে ইচ্ছে আমার, জগৎ জুড়ে যৌথ খামার”।




Comments

Popular Posts